সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪
৩১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

খুমেক হাসপাতালে মাসের পর মাস অপারেশনের অপেক্ষায় তিন শতাধিক ভর্তি রোগী!

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: মঙ্গলবার, জুন ২৫, ২০২৪

খুমেক হাসপাতালে মাসের পর মাস অপারেশনের অপেক্ষায় তিন শতাধিক ভর্তি রোগী!
আবু হেনা মুক্তিঃ
বাগেরহাটের রামপাল থেকে কোমরের সমস্যা নিয়ে আনার আলী ফকির খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন গত ২ মার্চ। প্রায় চার মাস ধরে ভর্তি থেকেও এখনও পাননি অপারেশনের সিরিয়াল। এরই মধ্যে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকায় অর্ধাহারে অনাহারে কাটছে আনার আলী ফকিরের পরিবার। প্রথম দুই এক মাস গ্রামের বাজার থেকে চাঁদা তুলে চিকিৎসা খরচ মেটালেও এখন অন্যের বাড়িতে কাজ নিয়ে বাবার চিকিৎসা খরচ দিচ্ছে আনার আলী ফকিরের মেয়ে। শুধু আনার আলী ফকির নয়। 
হাসপাতালের নিউরোসার্জারি, ইউরোলোজি, বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি, শিশু সার্জারিসহ অপারেশন প্রয়োজন এমন তিন শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছেন মাসের পর মাস। একমাস থেকে ৫ মাস পর্যন্ত রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন শুধু অপারেশনের জন্য। এতে একদিকে অপারেশনের সিরিয়াল না পেয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যু পথযাত্রী হচ্ছেন, অন্য দিকে ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকায় প্রতি মাসে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। 
নিউরো সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মহাসীন আলী ফরাজী বলেন, আমার বিভাগে রোগীদের ৪ থেকে ৫ মাস সিরিয়াল দিয়ে রাখতে হয়। আমাদের ও খুব খারাপ লাগে কিছু করতে পারিনা। আমাদের সার্জনের অভাব নেই। সপ্তাহে একদিন মাত্র একটি টেবিল আমাদের দেয়া হয়। ২ জন সার্জন অপারেশন করলে বাকি তিনজন সার্জনের দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না। প্রতি সপ্তাহে একটা থেকে সর্বোচ্চ দুইটার বেশি অপারেশন করতে পারি না। ওয়ার্ডে বেড আছে ২৫টি। যাদের সবারই অপারেশন লাগবে। আজকে যে রোগীটা ভর্তি হলো তার অন্তত সিরিয়াল পেতে ১৪ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের জন্য একদিন সম্পূর্ণ ওটি বরাদ্দ রাখলে বা অন্তত একটি টেবিলও যদি বাড়াতে পারি তাহলে আমাদের এই অপারেশন জট থাকবে না। আরও বেশি মানুষকে সেবা দিতে পারবো।
শুধু নিউরো সার্জারি নয় প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারির বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মোঃ তরিকুল ইসলাম, শিশু সার্জারি সহাকারি অধ্যাপক ডাঃ জাফর শরীফ শোভন এবং ইউরোলজি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডাঃ নিরুপম মন্ডল। সার্জনের অভাব না থাকলেও তারা অপারেশন থিয়েটার বরাদ্দ না পাওয়ায় অপারেশন করতে পারছেন না।
অপারেশন থিয়েটারের বর্তমান অবস্থা : হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ মিলে মোট অপারেশন থিয়েটার রয়েছে ৭টি। এর মধ্যে আন্তঃবিভাগে ৫টি ও বর্হিবিভাগে ২টি। জেনারেল অপারেশন থিয়েটারে শনিবার ও বৃহস্পতিবার গাইনী বিভাগ অপারেশন করে, রবিবার সার্জারি ইউনিট-২, শিশু সার্জারি ও বার্ণ ও প্লাস্টিক সার্জারি, সোমবার অর্থপেডিক্স বিভাগ, মঙ্গলবার নাক, কান গলা বিভাগ, বুধবার সার্জারি ইউনিট-১, নিউরোসার্জারি ও ইউরোলোজি অপারেশন করে। জেনারেল অপারেশন থিয়েটারের মোট ৪টি টেবিলের মধ্যে তিনটি টেবিল সচল। এছাড়া জরুরি অপারেশন থিয়েটারও বেশির ভাগ সময় দখলে থাকে গাইনী বিভাগের সিজার রোগী দিয়ে। এছাড়া জরুরি অপারেশন থিয়েটারে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতসহ ছোট অপারেশন করেন চিকিৎসকরা। এছাড়া চক্ষু বিভাগ তাদের নির্ধারিত অপারেশন থিয়েটার ব্যবহার করলেও নাক, কান বিভাগ তাদের অপারেশন থিয়েটার ব্যবহার করেন ছোট জরুরী অপারেশনের জন্য। 
অব্যবহৃত থাকতে থাকতে অকেজো অপারেশন থিয়েটার : হাসপাতালের  প্রসূতি বিভাগ ঘুরে দেখা যায় অপারেশন থিয়েটারে তিনটি টেবিল রয়েছে, যেখানে কখনওই অপারেশনই করেননি ঐ ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা। ফলে ফেলে রেখে নিজেদের অপারেশন থিয়েটার নষ্ট করছে, অন্যদিকে সপ্তাহে দু’দিন জেনারেল অপারেশন থিয়েটারে অপারেশন করে রোগীর জট তৈরি করছে। এছাড়া নাক কান গলা বিভাগের নিজেদের অপারেশন থিয়েটার ব্যবহার না করে জেনারেল অপারেশন থিয়েটার একদিন দখলে রাখে ফলে অব্যবহৃত থাকা গাইনী বিভাগের অপারেশন থিয়েটার গোডাউনে পরিণত হয়েছে। 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশাল এ অপারেশন থিয়েটার এখন নরমাল ডেলিভারি করার জন্য রাখা হয়েছে। অপারেশন থিয়েটার সচল করে গাইনী বিভাগের সকল অপারেশন সেখানে করা হলে হাসপাতালের অপারেশনের সিরিয়াল জট অনেকাংশেই কমে যেতো।
এনেস্থেসিয়া বিভাগের জনবলের তীব্র সংকট: হাসপাতালের এনেস্থেসিয়া বিভাগের ৪৫ জন জনবলের মধ্যে কাজ করছেন মাত্র ৭ জন। ১৯ জন এনেস্থেথিয়োলজিস্টের মধ্যে কার করছে মাত্র ২ জন। বিভিন্ন বিভাগ থেকে পার্ট ওয়ান করা চিকিৎসকদের এনেস্থেসিয়া বিভাগের ফাকা পদে বদলী করা হলেও ২২ জন চিকিৎসক এই বিভাগে বদলী হলেও কাজ করছেন অন্যান্য ওয়ার্ডে। আবার এনেস্থেসিয়া বিভাগে ডিগ্রিপ্রাপ্ত চিকিৎসককে অন্য বিভাগে বদলী করায় তিনিও কাজ করতে পারছেন না এই বিভাগে। ফলে এনেস্থেসিয়া বিভাগের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীরা। এনেস্থেসিয়া ডিপ্লোমা কোর্স চালু থাকায় এই শিক্ষার্থীদের দিয়ে নিয়মিত অপারেশন করানো হয় পড়াশুনার পরিবর্তে।
এনেস্থেসিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ দিলীপ কুমার কুন্ডু বলেন, ৪৫টি পদের মধ্যে ১৯টি পদ খালি বাকি ১৯ পদে আমার কাছে কাগজে কলমে থাকলেও কার্যত তারা এই বিভাগে কাজ করেন না। ফলে শুধু শিক্ষার্থী নির্ভর অবস্থায় কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে কোন রকমে। এই মুহূর্তে যারা কাজ করতে পারবে বিশেষ করে এনেস্থেথিয়োলজিস্ট ১৯ পদের ১৭টি খালি । এই পদে লোক দিলে আমরা হাসপাতালের অপারেশনের কাজ ও ২টি চলমান আইসিইউ কাজ চালিয়ে নিতে পারবো। অন্যথায় দিনরাত পরিশ্রম করেও আমাদের দারা অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। 
হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ গৌতম কুমার পাল বলেন, আমাদের অনেকগুলো অপারেশন থিয়েটার অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এগুলো ঠিক করা বা নতুন টেবিলের জন্য মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার পত্র দেয়া হলেও আমাদের কোন কথায় তারা কর্ণপাত করেন না। তাদের মত করেই চলেন। সিএমএসডি দিয়ে আমাদের কাছে চাহিদা চাওয়া হয় কিন্তু কোন কাজ করেন না তারা। এভাবে চললে সেবা দিতে পারবো না। তিনি বলেন, আমরা তো মানুষকে অপারেশনের জন্য সিরিয়াল দিতে পারছি না। কি করব। মেইন অপারেশন থিয়েটারেই একটি টেবিল নষ্ট। লাইট নষ্ট, এসি নষ্ট কিভাবে কাজ করবে। এভাবে চলতে পারে না। একাধিক চিঠি দিয়ে মন্ত্রণালয় আমাদের কোন কথা আমলে নেয় না।
0 Comments